৯০ দশকের বিটিভি পর্দার বিজ্ঞাপন


“যেখানে আছে ফুল , সুগন্ধ সেখানেই…….
স্কুল থাকলে , হোমওয়ার্ক থাকবেই……
ড্রামের তালে আছে ছন্দের খেলা….
যেখানে আনন্দ , সেখানে কোকা-কোলা……
কোকা-কোলা …..”

“আকাশে তারা জ্বলবে, পাখিরা গাইবেই
সবার জীবনে তৃষ্ঞা থাকবেই
তৃষ্ঞা মেটাতে এইতো আসল ……
আনন্দ সবসময়
কোকা কোলা……..”

ঠিকই ধরেছেন ।
৯৫ কি ৯৬ সালে বিটিভিতে প্রচারিত কোকাকোলার দারুণ জনপ্রিয় জিংগেল।

আরেকটু পেছনে, আমার প্রাইমারী স্কুল তথা শৈশবে জীবনে ফেরা যাক। ৯৪ এর জানুয়ারী, ভীষণ শীত , অথচ আমি অস্থির হয়ে আছি কোকা-কোলার তৃষ্ঞায় । কেবল আমার মত প্রাইমারী স্কুলের স্টুডেন্টরাই না , সেবার শীতে কোকা-কোলা তৃষ্ঞায় কাতর হয়ে রইল সারা দেশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোকা-কোলার সেই মার্কেটিং প্রমোশনকে সম্ভবত আর কেউ কখনও ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।

৯৩/৯৪ এর সেই বৈপ্লবিক কোকা-কোলার টিভি বিজ্ঞাপনে মডেল সিনেমার খলনায়ক জাম্বু। বিজ্ঞাপনে দেখা যায় আরব্য রজনীর দৈত্য জাম্বুর কাছে গাড়ি চাইছে এক তরুণ। দৈত্য জাম্বু তাকে কোকা-কোলা খেতে বলে ।

রুপকথা নয় , সত্যিই সত্যিই। কোকা-কোলার ২৫০ এমএল বোতলের ছিপির ভেতরে স্ক্র্যাচ করলেই কপালে মিলতে পারত ৬ টি মারুতি গাড়ি , একাধিক মোটর সাইকেল সহ নানা ধরণের অসংখ্য পুরস্কারের যে কোন একটি। আমার ভাগ্যটা অবশ্য সু=প্রসন্ন হয়নি মোটেও। টিফিনের টাকা তিলে তিলে জমিয়ে খাওয়া কোকে সর্বোচ্চ দু’টাকা পেয়েছিলাম একবার।

বাংলাদেশে তাবানী বেভারেজের বিদায়ের সাথে সাথে কাঁচের বোতলে ‘লিটার কোকও বিদায় হয়ে যায। কাঁচের বোতলে লিটার কোকের স্মৃতি ধরে রাখা আছে এই বিজ্ঞাপনে:

তাবানী বেভারেকের কোকের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পেপসির নিয়ন্ত্রণভার তখনও ট্রান্সকমের অধীনে আসেনি। বাংলাদেশ বেভারেজের পরিচালনায় পেপসি বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মত ,সবসময়ই তাদের বিজ্ঞাপনে তারুণ্যকে উপস্থাপন করত ।ঘরে এসে রাত-দুপুরে পেপসি চেয়ে বসা তন্বী-তরুণীর আব্দার মেটাতে গিয়ে গায়ক শুভ্রদেবের সুপার হিরো হয়ে ওঠা বিজ্ঞাপনটি এবং তার ডায়ালগ সেসময় ভীষণ জনপ্রিয় হল ।

তারও আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে করা পেপসির এই বিজ্ঞাপনটি সম্ভবত বেশ কয়েকবছর সমানভাবে জনপ্রিয়তা ধরে রাখে ।

আপনি যদি সেসময়কার প্রজন্মের হন , তবে বিজ্ঞাপনটি না দেখাটা বোধ করি অন্যায়ই হবে :)।পেপসির এই গুপ্তধনসম বিজ্ঞাপনটির মাঝে সম্ভবত প্রচন্ড নষ্টালজিক কোন শক্তি লুকিয়ে আছে , যার রেশ ধরে ছোটবেলায় দেখা আরও অনেক বিজ্ঞাপনচিত্র একটা একটা করে ভেসে উঠতে শুরু করল।

……………………………………
বিটিভিতে গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপন তখন বেশ নিয়মিত ।

“মনে পড়ে,
মনে পড়ে , মনে পড়ে
হৃদয় মেলিতো পাখা
বাধা সব হত দূর
ছোট ছোট কথা
ভালবাসায় ভরপুর

আর মনে পড়ে রেড-কাউ,
পরিবারের পুষ্টির বন্ধন। ”

কিংবা রেড-কাউ এর ৯০ দশকের গোড়ার দিকের এই বিজ্ঞাপনটি :

বাজারে তখন অস্ট্রেলিয়ার রেড-কাউ এর জয়জয়কার , তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ারই আরেক ব্র্যান্ড “ডিপ্লোমা”। দু’টো দুধই পাওয়া যেত একই রকমের হলুদ কৌটায়।

“ডিপ্লোমাআআ
দুধের সেরা দুধ ডিপ্লোমা”

সুরে সুরে দু’লাইনে নিজেদের শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা ডিপ্লোমার বিজ্ঞাপনটিও দারুণ লাগত।

কাছাকাছি সময়ে অ্যাংকর মিল্কের সুবাদে টিভি দর্শকরা জানলো নিউজিল্যান্ড নামক দেশটির পরিচয়:

“যে দেশে গরু খায় বারোমাস
সবুজ ঘাস
সেই দেশ , দুধের দেশ নিউজিল্যান্ড”

আমরা যারা সে সময়ের সে অসাধারণ বিজ্ঞাপনটি পেয়েছি তাদের চোখে নিউজিল্যান্ড দেশটির সাথে সাথে ড্যানিয়েল ভে্ট্টরির ছবির বদলে বিশাল বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর আর তাতে চড়ে বেড়ানো গরুর ছবিটিই আগে ভাসে।

অ্যাংকর মিল্কের এই বিজ্ঞাপনটিও পেয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা:

ছোট্টমণিটির “আম্মু তুমি লক্ষীইইই” কথাটি পুরো ৯০ দশকের টিভি বিজ্ঞাপনে সবচেয়ে মায়া ভরা উক্তি ।

……………………………………
আপনার প্রিয় চা-পাতা কোনটি ? মির্জাপুর ? লিপটন ? টেটলি ? শ’ওয়ালেস? নাকি অন্য কিছু ?
উত্তরটা যাই হোক, “আসল চা” ছিল কিন্তু একটাই — ফিনলে চা ।

সেসময়কার বিজ্ঞাপনে অভিনেতা আবুল হায়াতের ভাষায় — “ফিনলে চা, আসল চা” । চা খেতে খেতে বাবার মুখে “আসল চা” কথাটি শুনে মেয়ে নাতাশা হায়াত জানতে চায় , তার বাবা কেন ফিনলে চা খাওয়ার সময় “আসল চা” কথাটি উচ্চারণ করে। মেয়েকে কথার গুরুত্ব বোঝাতে আবুল হায়াত সোজা হাজির হন সিলেটে ফিনলের চা বাগানে । ফিনলের নিজেদের বাগানে উন্নতমানের পাতা তুলে বাগানেই প্যাক করা হয় এসব কিছু দেখানোর পর আবুল হায়াত আরেকবার বলেন “ফিনলে চা , আসল চা”

“আসল চা” জিনিসটা ফিনলের ট্রেড-মার্ক হয়ে যাবার পর ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ফিনলে একই কথা ব্যবহার করে এই বিজ্ঞাপন তৈরি করে , এবার মডেল হলেন আফসানা মিমি।

অন্যদিকে , “নকল চা” কোম্পানীগুলোও বসে রইল না :) । “আসল চা” হওয়াই তো শেষ কথা নয়, ভাল চা তো হতে হবে। নোবেল যেমন বলতেন এইচ-আর-সি চা দিয়েই টি-ব্রেকটা নিতে:
Take take …take a break…
take e hrc break…….

অথবা বাজার থেকে হারিয়ে যাওয়া “ডানকান চা” এর সেই অসাধারণ বিজ্ঞাপনটি:

……………………………………
শুধুই কি চা হলেই চলবে? সাথে চাই ভাল কনডেন্সড মিল্ক ।
৯৪ এর দিকে বিটিভিতে সেসময় ব্লু-ক্রস কনডেন্সড মিল্কের মেলোডিয়াস সুরের ইংরজি ভাষার একটি বিজ্ঞাপন বেশ মনে ধরেছিল।

দশকের মাঝামাঝি সময়কার স্টার-শিপ কনডেন্সড মিল্কের হৈ-হল্লোড়ে ভরপুর সেই:

“বেশি স্বাদ, বেশি স্বাদ , বেশি কাপ চা
স্টার-শিপ মানেই বেশি কাপ চা”

বিজ্ঞাপনটি সেসময়কার সব দর্শকের মনে থাকার কথা ।

৯০ দশকের শেষদিকে ড্যানিশ কনডেন্সড মিল্কের বাংলায় ডাব করা ভারতীয় এই বিজ্ঞাপনটি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল।

……………………………………
কসমেটিকসের বিজ্ঞাপনের মাঝে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ম্যানোলা ক্রিমের সুরেলা সেই বিজ্ঞাপনটির কথা:

“ম্যানোলা মানে টলমল শিশিরের লাবণ্য
ম্যানোলা মানে কমনীয় সুরভী অনন্য।”

সেসময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার পেছনের কাভার-পাতায় ম্যানোলার উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। সম্ভবত ৯০ দশকেই ম্যানোলা কসমেটিকস ফ্যাক্টরিটি বন্ধ হয়ে যায়।

৯০ দশকের মাঝামাঝি কি শেষ সময়ে বাজারে এলো কেয়া কসমেটিকস। প্রথম দিককার প্রায় সবক’টি বিজ্ঞাপনে নোবেল-মৌ জুটিবদ্ধ হলেও আমার কাছে সেরা ছিল কেয়ার সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপনটি । মৌ বিহীন সে বিজ্ঞাপনে নোবেলের সাথে জুটিবদ্ধ মডেলটির নাম মনে নেই , কিন্তু সুরেলা জিংগেলটি আজও ভেতরে বাজে :

“তারারা হারায় , হারায় চাঁদের আলো
তোমার চুল এমন আঁধার কালো

ভালবাসা মানে তুমি আর আমি শুধু দু’জনেই…..
ভালবাসা মানে দু’জনেই কবি”

ঝাকড়া চুলের মডেল ফয়সাল(জয়া আহসানের স্বামী) সে সময়েই কিউট রোমান্সের এই অ্যাডটি করে দারুণ আলোচিত হন:

বিজ্ঞাপনের কথাগুলো আর সুর ছিল অসাধারণ , অনেক অনেকদিন মনে রাখার মত :

“তুমি ছাড়া আমি যেন আমি নই, অন্য মানুষ কোন….
সৌরভে অনুভবে তুমি …………….।
তুমি আছো তাই , প্রতিদিন কোমলতা পাই ।
রোমান্স ………”

দাড়ির মাজেজা শৈশবে ঠিকমত বোঝা দায় বলে মডেল শিমুলের বিপুল জনপ্রিয় “কুল শেভিং ক্রিমের” বিজ্ঞাপন দেখে বিরক্তই হতাম । তার চাইতেও বেশি বিরক্ত লাগত সুন্দরী মডেল ফারদিনের করা “তিব্বত ল্যাদার শেভিং ক্রিম” এর এই বিজ্ঞাপনচিত্রটি :

আলিফ-লায়লার মাঝে বিজ্ঞাপন বিরতিতে মেরিল বেবি লোশন এর অ্যাডের কথাগুলো মুখে মুখে ফিরত :

“তু রু রু তাত-তা
উল লি লি লি পাপ্পা …।।।। উম্মা
জু জু জু জা ।।।।। সোনাজাদুমনি
পা রা প্পা পা , পারাপ্পা
সোনাজাদুমনি লে, সোনাজাদুমনি লে”

তিব্বত বেবী লোশনের এই বিজ্ঞাপনটি মেরিলের মত জনপ্রিয়তা না পেলেও এটির সূত্র ধরেই মেরিল বেবী লোশনের স্মৃ্তিগুলো সাড়া দিল:

ডেটল বা স্যাভলনের বিজ্ঞাপনগুলি এখনও কমবেশি এমনই রয়ে গেছে:

……………………………………
৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে কমার্শিয়াল ব্রেকগুলোর একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল নানান প্রিন্টের শাড়ি।
শাড়ির বেশির ভাগ বিজ্ঞাপন ছিল সলো , অর্থাৎ মডেল কেন্দ্রিক । ৩০ সেকেন্ডে শাড়ির প্রশংসা সম্বলিত জিংগেলের সাথে ইনডোর সেটে মডেলরা যতসংখ্যক বেশি শাড়ি পড়ে কখনও আঁচল উড়িয়ে , কখনও বা পাখির মত হাত প্রসারিত করে , কিংবা আঁচল চারদিকে ছড়িয়ে মাঝে চুপটি মেরে বসে বিজ্ঞাপনে অভিনয় করতেন। বিটিভির পর্দায় , বিশেষ করে শুক্রবারের বাংলা সিনেমা চলাকালে বহুল প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনে বিজরী বরকতুল্লাহ নন্দিনী প্রিন্ট শাড়ি পড়ে হাজির হতেন:

সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হত ঢালিউডের তৎকালীন অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রী “দিতি”র পাকিজা প্রিন্ট শাড়ির এই বিজ্ঞাপন-চিত্রটি:

জনী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপনে শাবনূরকে দেখা যেত স্টেজ কাঁপিয়ে দ্রুম-দ্রুম নাচ নাচতে। সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ি পড়তেন সুন্দরী মৌসুমী,
বিজ্ঞাপনের সুরে:

“প্রিয় প্রিয় প্রিয়,
সুন্দরি সুন্দরি সুন্দরী……..
প্রিয় প্রিয় সুন্দরী
সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ি সুন্দরী”

বৌরানী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপনটি ছিল দারুণ মজার। অফিসে যাওয়ার আগে স্বামীর শা্র্টের পেছনে বৌরানী শাড়ি কেনার নোটিশ সেঁটে দেয় স্ত্রী । অতঃপর , যার সাথেই দেখা হয় ……..

“আপনার স্ত্রীর জন্য বৌরানী প্রিন্ট শাড়ি কিনতে ভুলবেন না কিন্তু।”
–“ঘরের কথা পরে জানলো ক্যামনে?”
“এই যে, এ্যামনে”

গায়ক আগুনের কন্ঠে
“”তুমি সেই তুলনাহীনা
অপলক আমার এ নয়ন
চেয়ে থাকে শুধু সারাক্ষন””

জিংগেলের সাথে অভিনেত্রী বিপাশার করা জনী প্রিন্ট শাড়ির অপর আরেকটি বিজ্ঞাপন অন্য শাড়ির বিজ্ঞাপনগুলো থেকে কিছুটা হলেও আলাদা ছিল ।

…………………………………………
বিপাশার করা এই বিজ্ঞাপনটি

অন্য আরেকটি বিজ্ঞাপনের কথা খুব মনে করিয়ে দেয় , সেটি ছিল মধুমতি লবণের বিজ্ঞাপন।

রান্নাঘরে ত্রস্ত পায়ে প্রবেশ করে স্ত্রীকে নতুন একটা লবণের প্যাকেট দেয় স্বামী।
নতুন লবণ দেখে…..
—ও লবণ , নাম কি ?(একটু ভাব নিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে স্ত্রী)
-মধুমতি (স্বামী , একটু কাশি দিয়ে)
—তফাৎটা কি ? (গলায় ঝাঁজ টেনে স্ত্রী)

স্বামী রান্নাঘরের বাতি অন আর অফ করতে থাকে ক্রমাগত । স্ত্রীর চাহনিতে প্রশ্ন, এর অর্থ কি?

এরপর সুরে সুরে শুরু হয় স্বামীর পার্থক্যের বর্ণনা :

– “রাত আর দিন ভাই , রাত আর দিন
মধুমতি লবণে আছে আয়োডিন

লবণটা মিহি ভাই , লবণ মিহি
মধুমতি
তফাৎটা তাই আয়োডিন ”

…………………………………………
শুক্রবার দুপুর ১২ টার দিকে বিটিভিতে প্রচারিত টারজান, মোগলী কার্টুন কিংবা স্পেল-বাইন্ডারস সিরিজের ফাঁকে অবিচ্ছেদ্দ্য অংশই যেন হয়ে গিয়েছিল বাটার সেই বিজ্ঞাপন:
“I wanna gain,
We go out of range
I am going to be formal
I am going to be normal
I am going for style
We are going for smile
I am changing my look,
Going by the book,
I all for design
We are for the new line
I am going for fashion,
To makes a passion,
We making the write book,
I am to the groove,
we are going for sweet
We are going for making……
Bata papa bata papa bata………….”

পরবর্তীতে বাংলায় বাটার স্লোগান হল — “পায়ে পায়ে বাটা”। সেই স্লোগানসম্বলিত তুলনামূলক সমসাময়িককালের একটি বিজ্ঞাপন :

একই সময়ে ছোটদের মাঝে দারুণ ক্রেজ তৈরি করেছিল কেডসের গোড়ালিতে আলো জ্বালা

জাম্প, জাম্প , জাম্প কেডস

এর বিজ্ঞাপনটি।

হারিয়ে যাওয়া রূপসা চপ্পলের কথাই বা বাদ দিই কি করে ? চপ্পলের প্রচলন আগের চেয়ে কিছুটা কমে গেলেও সেসময়টায় চপ্পলই ছিল আপামর জনসাধারণ প্রথম পছন্দ

সমুদ্র-সৈকতে চপ্পল পড়ে একদল ছেলেমেয়েকে রূপসা চপ্পল পড়ে লাফ-ঝাঁপ , সাথে মাথা নাড়িয়ে গেয়ে যাওয়া সেই :
“রুপসা রুপসা রুপসা,
নরম নরম হাওয়াই চপ্পল রুপসা”

…………………………………………
সেসময় রঙের বিজ্ঞাপনের জিংগেলের ব্যবহারে নতুন মাত্রা আনলো রোমানা , ওদের বেশ কিছু বিজ্ঞাপন খুব জনপ্রিয়তা পেল।

রোমানার প্রথম বিজ্ঞাপন ছিল:

“দেখো দেখো দেখোরে রঙেরই বাহার
দেখো রোমানার বাহার”

আরও দেখুন তো মনে পড়ে কিনা:

“”সময়তো বদলায়
বদলায় বদলায় মন
মনের গভীরে আছে চির আপন
রোমানা আপন রঙ , চির আপন””

বাজারের অন্যান্য অনেক রঙের থেকে খারাপ কোয়ালিটি হওয়া সত্ত্বেও কেবল বিজ্ঞাপনের জোড়ে রোমানা পরিণত হল সর্বাধিক বিক্রিত রঙে ।

টিভি স্ক্রীণে রোমানার সাথে বিজ্ঞাপন-যুদ্ধে অংশ নেয়া পেইলাকের
“”রং রং রং রং রং
পেইলাক মনের মত রং””

বা অ্যাকুয়া পেইন্টসের এই বিজ্ঞাপনটিও বেশ সমাদৃত হয়েছিল:

……………………………………
“”যুগের সাথে চলো
ইকোনো লিখে ভাল
ইকোনো সবার প্রিয়
ইকোনো বলপেন””

আক্ষরিক অর্থেই পুরো ৯০ এর দশক জুড়ে বাংলাদেশ ইকোনো দিয়ে লিখে গেছে। পাশাপাশি ছিল “রাইটার বলপেন” , কিংবা প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের মডেলিং করা :

“”সাব্বাস!!
বলপেন ক্যাম্পাস।।
লেখে ভাল, চলে ভাল…
বলপেন ক্যাম্পাস …সাব্বাস!!””

৯৩/৯৪ এর দিকে অলিম্পিক বলপেনের এই অ্যাডটি নিয়মিতই দেখা যেত :

দশকের শেষভাগে “অলিম্পিক বলপেন”ও বেশ ভাল বাজার পায়।

…………………………………………
ডালডা , বনস্পতি ঘি এর কথা এখন বলতে গেলেই শোনাই যায় না , অথচ সে সময়কার বিজ্ঞাপুনগুলিতে এসব বেশ দেখা যেত, যার মাঝে অন্যতম ছিল “পাঞ্জা বনস্পতি”র এই বিজ্ঞাপনটি:

আরও ছিল রেড-কাউ বাটার ওয়েল:

খাবার টেবিলে কথপোকথন:
“–আচ্ছা ভাবি , তোমার হাতে কি জাদু আছে? (দেবর/ননদের প্রশ্ন)
-জাদু আমার হাতে নেই , আছে অস্ট্রেলিয়ার রেড কাউ বাটার ওয়েলে ।মা-ই তো আমাকে শিখিয়েছেন।
**বউমা ঠিকই বলেছেন , রেড-কাউ বাটার ওয়েলে রান্না করলে… (শ্বাশুড়ি)
## হ্যাঁ, রেড-কাউ বাটার ওয়েল আমিই তো কিনি (শ্বশুর)”

……………………………………
ঢাকায় রিয়েল এস্টেট তথা নিজের ফ্ল্যাটের ধারণাটি জোরেশোরে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে ৯০ দশকের শুরুর দিকেই। তার ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরা গ্রুপ এবং ইসলাম গ্রুপের কিছু বিজ্ঞাপন টিভিতে প্রচারিত হত । কিন্তু রিয়েল এস্টেট বিজ্ঞাপনের প্রথম চমকটা প্রথম নিয়ে আসে বেক্সিমকো গ্রুপ। ৯৮ কি ৯৯ এ টিভিতে প্রচারিত তিনটি বিজ্ঞাপন সে সময়কার দর্শকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। শুধু তিনটি বাক্য দিয়েই আলাদা করে বিজ্ঞাপন তিনটি এখনও বেঁচে আছে।

“সুন্দর বাড়ি হলো, এবার সুন্দর দেখে একটা বউ আন”

“এই যে শোন! ব্রিজের কন্ট্রাক্টটা পেয়ে গেলাম

“বাড়ী?? আমার জন্য বাড়ী ?”

…………………………………………

যে দু’টো বিজ্ঞাপনের কথা না বললে ৯০ দশকের বিজ্ঞাপনোস্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ রয়ে যায় , তার একটি হল মিতা নূরের সেই


“আলো , আলো , বেশি আলো”র অলিম্পিক ব্যাটারির বিজ্ঞাপনটি।

অন্যটি হল:
বাতির রাজা ফিলিপস

অসম্ভব মজা পাওয়া যে বিজ্ঞাপনটিকে ক্লাসিকের মর্যাদা দেয়া যায় , সেটি হল ফেরদৌস ওয়াহিদ( হাবীব ওয়াহিদের পিতা) এর খুশখুশে কাশি দূরকারী ম্যাটসিলস লজেন্সের টিভি কমার্শিয়ালটি :

………………………………………………
এমন কোন বিজ্ঞাপন কি ছিল যেটি সে সময়ের গন্ডিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল । আমার চোখে সেরকম একটি বিজ্ঞাপন ছিল — নিউ জড়োয়া হাউজের বিজ্ঞাপন। জুয়েলার্সের বিজ্ঞাপনের চিরাচরিত ধারা থেকে বেরিয়ে নিউ জরোয়া হাউজের বিজ্ঞাপনটি পেয়েছিল নতুন মাত্রা। ৯৬ বিশ্বকাপ ক্রিকেট, বিশ্বকাপ ফুটবল বা এশিয়া কাপের মত বড় আসরের ফাঁকে বারবার স্ক্রীণে ভেসে আসা আসাদুজ্জামান নূরের আবৃত্তিতে বিজ্ঞাপনের জিংগেলটি সে সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে দিয়েছিল বিজ্ঞাপনটিকে

“তুমি সুন্দর
সূর্যের তীব্রতায় জ্বলে উঠো
খরতাপ মুছে দিয়ে বর্ষার প্রশান্তি নামাও
হাসিতে তোমার
শরতের রুপে তোমারই হাসির সুর
হেমন্তের ঝরা পাতায় তোমার বন্দনা
নিঃসঙ্গ শীতের মত তুমি অচেনা সুদূর
বসন্তের যৌবন তুমি হে সুন্দর আমার”

Leave a Reply


SEO Powered By SEOPressor