মোটরসাইকেল চালানো-নবিস ও প্রফেশনালদের জন্য!

এই লেখা গুলো আগেই লিখে রেখেছিলাম নিজস্ব ব্লগে। কিন্তু সবার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ ছিলনা।- কারো যদি কাজেই না আসে তাহলে কি লাভ? টেকটিউনস- কে ধন্যবাদ। তাহলে শুরু করা যাক।

আরোহন পর্ব-২য় অধ্যায়

এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব কিভাবে মোটরসাইকেল সঠিকভাবে চালাতে হয়। হাতে কলমে অভ্যেস না করলে এই অধ্যায় মুখস্থ করে ফেললেও আপনার কোন লাভ হবেনা। মোটর সাইকেল অবশ্যই যিনি চালাতে জানেন এমন কারো কাছে শেখা উচিত। বিশেষ করে মূল বিষয়গুলো। প্রথমে যে মোটর সাইকেলটি চালাবেন তার সমস্ত কন্ট্রোল সম্পর্কে জেনে নিন। গিয়ার শিফ্ট কি করে  করতে হয়, কি করে ব্রেক কষতে হয়, সিগন্যাল, হেড লাইট ও হর্নের সুইচ কোথায়, ইঞ্জিন কীল/কাট অফ্ সুইচ কোথায় ইত্যাদি। আপনার রিয়ার ভিউ মিরর রাস্তার সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিন। প্রথম দিন মোটর সাইকেল চালাতে হলে এমন জায়গা বেছে নেওয়া উচিত যা হবে নিরিবিলি অথচ পাকা রাস্তা। অনেকে মাঠে শেখার জন্য বলেন, কিন্তু মাঠের একটা মুশকিল হলো ঘাস ভেজা হলে (বিশেষ করে শীত-বর্ষাকালে) স্লিপ করে পড়ে যাওয়ার একটা সম্ভবনা থাকে। তবে অন্য কোন ভাল জায়গা না পেলে মাঠেই শেখা উচিত।

1.     প্রয়োজনীয় পোশাক পরে নিন।

2.      আপনার বাইকার বন্ধুকে সাথে নিন।

3.     মোটরসাইকেলের সমস্ত কন্ট্রোল সম্পর্কে জেনে নিন:-

 

> জেনে নিন কোথায় কোন সুইচ আছে এবং সেগুলো কাজ করে কিনা; থ্রটল, ক্লাচ, ব্রেক, হর্ন, টার্ন সিগন্যাল, হেড লাইট সুইচ, হাই-লো বীম সুইচ, ব্রেক লাইট, টায়ার, টায়ারের এয়ার প্রেসার, ফুয়েল সাপ্লাই ভালভ, ইঞ্জিন অয়েল লেভেল, ব্রেক অয়েল লেভেল এবং ইঞ্জিন কাট অফ সুইচ (সব  মোটর সাইকেলে এটি থাকেনা।)। টায়ারের প্রয়োজনীয় এয়ার প্রেসার চেক করুন।

 পিঠ সোজা করে বসুন। আপনার ঘাড় থাকবে সোজা। সোজা সামনে তাকান যাতে আপনি পুরো রাস্তা দেখতে পান। বাইকের সীটের এমন স্থানে বসুন যেখান থেকে সহজেই আপনি স্টিয়ারিং হ্যান্ডেল কন্ট্রোল করতে পারেন। অনেকেই সীটের শেষ মাথায় বসেন। এটাতে হ্যান্ডেল ধরতে একটু অসুবিধা হয়। হ্যান্ডেল ধরা অবস্থায় আপনার কনুই থাকবে সামান্য বাঁকা। বেশ শক্ত করে হ্যান্ডেল বার ধরে থাকবেন নইলে রাস্তা খারাপ থাকলে চট করে হ্যান্ডেল হাত থেকে ছুটে যেতে পারে। আপনার ডান হাত দিয়ে থ্রটল এমন ভাবে ধরুন যাতে আপনার তালুর নিচের অংশ সামনের টায়ারের দিক নির্দেশ করে। এতে করে আপনার থ্রটল বেশি ঘুরে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। ছবি দেখুন:-

সঠিক নিয়ম                     ভুল নিয়ম

আপনার হাঁটু তেলের ট্যাংকের সাথে লাগিয়ে রাখুন। এতে বাইক কন্ট্রোল সহজ হবে। আপনার পা ঠিকমত ফুট পেগসে রাখুন। অনেকে পায়ের সামনের অংশ ঝুলিয়ে নেন-যা বিপদজনক।

1.      এখন ইঞ্জিন কীল সুইচ অফ করে নিন। সমস্ত সিগন্যাল লাইট অফ করে নিন। বাইক নিউট্রাল আছে কিনা ইন্ডিকেটর চেক করুন। কীক স্ট্যান্ড ওঠানো আছে কিনা দেখে নিন। আপনার ইঞ্জিন ঠান্ডা থাকলে সহজে স্টার্ট নাও হতে পারে। ইঞ্জিন স্টার্টের আগে চোক অন করে নিলে ইঞ্জিন স্টার্ট করতে সহজ হয়। (এই সুইচটি সাধারনত: ক্লাচ এর কাছাকাছি থাকে অথবা, নীচে ইঞ্জিনের পিছনে থাকে।) চোকের সাধারনত: দুইটা ধাপ থাকে-প্রথমে সম্পূর্ন চোক অন করে ইঞ্জিন স্টার্ট করুন; ১ মিনিট পর চোক সুইচ মাঝ বরবার নিয়ে আসুন। ৪/৫ মিনিট ইঞ্জিনকে গরম হতে দিন। এরপর চোক অফ করে দিন। ইঞ্জিন গরম থাকলে চোক সুইচ অন না করলেও চলে।  ইঞ্জিন স্টার্টের জন্য কিক স্টার্ট করাই ভালো। তাহলে আপনার ব্যাটারী খরচ কম হবে। (বিশেষ করে ইঞ্জিন যখন ঠান্ডা থাকবে।) ইঞ্জিন স্টার্ট এর সময় খেয়াল রাখুন আপনার গিয়ার পজিশন নিউট্রালে আছে। নইলে আপনার বাইক ছোট্ট লাফ দিতে পারে এবং সেইসাথে ইঞ্জিনের ক্ষতি হতে পারে।

2.      হ্যান্ডেলের বাম পাশের লিভারটির নাম ক্লাচ। ক্লাচ এর কাজ হচ্ছে ইঞ্জিন থেকে গিয়ারের অংশকে আলাদা করা। অর্থাৎ ক্লাচ চেপে ধরলে ইঞ্জিনের কোন শক্তিই থাকেনা আর ক্লাচ ছেড়ে দিলে গিয়ার এ ইঞ্জিনের শক্তির  সংযুক্তি ঘটে।

ক্লাচ দু’ভাবে ধরা যায়। ছবিতে দেখুন দুই আংগুল বা চার আংগুল ব্যবহার করা হয়েছে। যেটাতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন সেভাবেই ধরুন।

ক্লাচ লিভার সম্পূর্ন চেপে ধরে গিয়ার পরিবর্তন করুন। উল্লেখ্য যে, স্পোর্টস বাইক গুলোতে দু’ আঙ্গুল ব্যবহার করে ক্লাচ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু আমরা সাধারনত: যে সব বাইক চালিয়ে থাকি সেগুলোতে চার আংগুল ব্যবহার করে ফুল ক্লাচ করতে হয়। গিয়ার ফাংশন এক এক মোটর সাইকেল এক এক রকম। কোনটা সামনে বা নিচে চেপে গিয়ার এনগেজ্ড করা হয়, পিছনে চেপে বা উপরে উঠিয়ে নিউট্রাল;  আবার কোনটা সামনে বা নিচে চেপে নিউট্রাল, পিছনে বা উপরে উঠিয়ে গিয়ার এনগেজ্ড করা হয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এক মোটরসাইকেলেই দুই নিয়মে গিয়ার শিফ্ট হয়। এখানে ছবি দেখুন দুই ধরনের গিয়ার লিভার দেখানো হয়েছে:-

>  আপনার মোটর সাইকেল এখন First Gear আছে। এবার ধীরে ধীরে ক্লাচ ছাড়ুন এবং ধীরে ধীরে থ্রটল/অ্যাক্সিলেটর দিন। এখন আপনার বাইক চলতে শুরু করছে। আপনার দৃষ্টি থাকবে সোজা রাস্তার দিকে। First Gearসাধারনত: উঁচু জায়গাতে ওঠার জন্য ব্যবহার করা হয়। এই গিয়ারে বাইকের শক্তি বেশি থাকে কিন্তু গতি থাকে একদম কম। ক্লাচ অল্প ছেড়ে থ্রটল বাড়িয়ে কি করে আস্তে আস্তে বাইক চালানো যায় তা বার বার প্র্যাকটিস করে বুঝে নিন। আসলে ক্লাচ যতটা না ইঞ্জিন অন-অফ সুইচ তার চাইতে বেশি রেগুলেটর সুইচ । আমরা ফ্যানকে যেমন রেগুলেটর ঘুরিয়ে কন্ট্রোল করতে পারি; তেমনি ক্লাচ অল্প বা বেশি চেপে আমরা ইঞ্জিনের গতি কে কন্ট্রোল করতে পারি। এটা বেশ কয়েকদিন প্র্যাকটিস করলেই আয়ত্তে এসে যাবে।

First Gear থেকে এবার second gear দিতে শিখবো। থ্রটল বাড়িয়ে বাইকের স্পিড তুলুন। তারপর থ্রটল সম্পূর্ন কমিয়ে দিয়ে ক্লাচ সম্পূর্ন চেপে second gear দিন। এবারও ধীরে ধীরে ক্লাচ ছাড়ুন এবং ধীরে ধীরে থ্রটল/অ্যাক্সিলারেট করুন। second gear   এ মোটর সাইকেলের গতি খুব কম থাকে। সুতরাং এই গিয়ার ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে চালানোর জন্য ভাল। second gear এ third gear নিয়ম আগের মতই। গতির সাথে সমন্বয় করে গিয়ার শিফট করুন। তবে নতুনদের জন্য টপ গিয়ার ব্যবহার করার দরকার নেই।  third gear   দিয়ে বাইকের গতি ২০/৩০ কি:মি: এর মধ্যে রেখে চালানো অভ্যেস করুন।

ব্রেকিং:- ‘‘ব্রেক করলেই তো থামবে, এতে আর শেখার কি আছে।’’ ব্রেকিং-টা খুব সহজ বিষয় নয়; বহুবার প্র্যাকটিস ছাড়া এটি আয়ত্ত্ব করা সত্যিই কঠিন। মোটরসাইকেল থামাতে চাইলে আপনার গতি যদি ঘন্টায় ৪৮ কি:মি: গতিতে থাকে; তাহলে যেখানে থামতে চান সেখান থেকে ৩০ ফুট দূরত্ব বাকি থাকতে ব্রেক চাপতে হবে। আপনার গতি যদি ঘন্টায় ৯৬ কি:মি: গতিতে থাকে; তাহলে যেখানে থামতে চান সেখান থেকে ১২০ ফুট দূরত্ব বাকি থাকতে ব্রেক চাপতে হবে। আপনার গতি যদি ঘন্টায় ১৯০ কি:মি: গতিতে থাকে তাহলে ব্রেক চাপতে হবে- যেখানে থামতে চান ৪৮০ ফুট দূরত্ব বাকি থাকতে । আমাদের দেশে যদিও এত জোরে চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু হিসাবটা হচ্ছে এই- আপনার বাইক যত জোরে চলবে বস্ত্ত থেকে তত দুরে থাকতে ব্রেক কষতে হবে। মোটর সাইকেলের গতি মাপা গেলেও বস্ত্তর দূরত্ব নির্ণয় করা কঠিন। সে’জন্য ফাঁকা রাস্তায় কোন কিছুকে টার্গেট করে বাইক থামানো প্র্যাকটিস করুন। কেননা আপনার মোটরসাইকেল ডিস্ক ব্রেক না ড্রাম ব্রেক তার উপরও থামানোর নিয়ম নির্ভর করে। আপনার মোটর সাইকেল ম্যানুয়ালে  লেখা আছে সঠিক ব্রেকিং টাইম। বাইকের গতি কমাতে চাইলে অনেক সময় থ্রটল কমিয়ে দিলেই কাজ হয় অর্থাৎ ইঞ্জিনই ব্রেকের কাজ করে। তবে যদি ব্রেক করতেই চান তাহলে সম্পূর্ন ক্লাচ চেপে সামনের ব্রেক ও পিছনের ব্রেক ধীরে ধীরে চাপতে হবে। এই পদ্ধতি সাধারণ অবস্থার জন্য প্রযোজ্য। মোটর সাইকেল থামানোর জন্য সামনের ব্রেকই বেশী কার্যকর। কারন ব্রেকিং এর সময় আপনার ওজন সামনের দিকে ট্রান্সফার হয়। সামনেরটা চেপে ধরার পরপরই পিছনেরটা চাপতে হবে। তাহলে বাইকের ব্যালান্স ঠিক থাকবে।  “Release the front brake even slower than you squeeze it on.”

‘‘সামনের ব্রেক ধরার চাইতে ছাড়ার সময় আরও আস্তে আস্তে ছাড়ুন।’’ এতে আপনার শরীরের ওজন দুই চাকাতেই সমান ভাবে ভাগ হয়ে যাবে। মোটর সাইকেল ঠিকভাবে থামানোটা খুবই জরুরী।  কিন্তু সত্যিকার অর্থে প্র্যাকটিস ছাড়া স্পিডের উপর বাইক থামানো বেশ কঠিন কাজ। সামনের ব্রেকে আছে ৭০% বাইক থামানোর ক্ষমতা। অনেক এক্সপার্ট পিছনের ব্রেককে পাত্তায় দেননা। তারা ‘‘ব্রেকী’’ জানেন। কিন্তু আপনি দুটো ব্রেকই ব্যবহার করুন।  গতির উপর হঠাৎ এই ব্রেক কষলে বাইক স্লিপ করে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভবনা। খুব দ্রুত মোটর সাইকেল থামাতে চাইলে ক্লাচ সম্পূর্ন চেপে ধরে সামনের ব্রেক চেপে তারপর পিছনের ব্রেক চাপতে হবে।  এটা কোন ফাঁকা রাস্তায় বহুবার প্র্যাকটিস করুন। হঠাৎ স্পিডের মধ্যে ব্রেকের প্রয়োজন হলে এটা খুব কাজে দেবে। সুতরাং ভালমত প্র্যাকটিস করে এক্সপার্ট হয়ে নিন।

অথবা সামনের ব্রেক চেপে ধরে আবার ছেড়ে দিয়ে আবার ধরুন। তাহলেই ব্যালান্স ঠিক হয়ে যাবে। সবগুলো কাজই বহু প্র্যাকটিস দরকার।  যেখানে তীক্ষ্ম বাঁক, ভেজা রাস্তা, কাদা বা তেলতেলে রাস্তায় সেখানে সামনের ব্রেকের চাইতে পিছনের ব্রেক চেপে সামনেরটা চাপতে হবে। ক্রুজার টাইপ মোটরসাইকেলে পিছনের ব্রেক ভালো কাজ করে। হঠাৎ করে খুব জোরে ব্রেক কষবেননা।

 

ইমারজেন্সি ব্রেকিং:

মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি আসে যেখানে আপনার সাথে সাথে থেমে যাওয়া প্রয়োজন হয়। এখানে কিছু টিপস দেওয়া হলো।

·     একসাথে দুটো ব্রেক যথেষ্ঠ জোরে চাপুন। হ্যান্ডেল সোজা ও শক্ত করে ধরে রাখুন-নইলে বাইক স্কিড করতে পারে। সোজা স্কিড করলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকবেনা।

·     আপনার দৃষ্টি থাকবে সোজা সামনের দিকে। টায়ারের দিকে তাকিয়ে থাকবেননা।

·     সামনের ব্রেক একবার ধরে তখনই ছেড়ে আবার ধরুন। এতে আপনার শরীরের সাথে বাইকের  ভারসাম্য ঠিক থাকবে। তবে পিছনের ব্রেক মোটরসাইকেল না থামা পর্যন্ত একবার কষলে তা ধরেই রাখবেন। সামনের ব্রেকের মত করবেননা।

·     বাঁক নেওয়ার সময় ব্রেক করা মোটেই উচিত নয়। এতে পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন যে আপনাকে ব্রেক করতেই হবে তাহলে হার্ড ব্রেক করবেননা। ধীরে ধীরে দুটো ব্রেক কষবেন। মনে রাখবেন, নিরাপত্তার জন্য খুব আস্তে চালানো নিরাপদ নয়!! ঘন্টায় ১৫ কি:মি: চালানোর চেয়ে ঘন্টায় ৪০ কি:মি: চালানো অনেক সুবিধাজনক!!

Leave a Reply


SEO Powered By SEOPressor